অ্যাসিডিটির ঘরোয়া ঔষধ হাতের কাছেই

আমদের দৈনন্দিন জীবন যাপনে অ্যাসিডিটির সমস্যা নেই, খুঁজলে এমন লোকের সংখ্যা খুব কমই পাওয়া যাবে। কম বেশী আমরা সবাই  অ্যাসিডিটি সমস্যায় ভুগি। অ্যাসিডিটি এমন একটি অবস্থা যেখানে পাকস্থলীর অম্ল খাদ্যনালীতে ফিরে আসে । যার ফলে বুকজ্বালা, পেট ফোলাভাব, বমি বমি ভাব দেখা দেয়।

পাকস্থলীতে অতিরিক্ত অ্যাসিড তৈরি হলে অ্যাসিডিটি হতে পারে। এর কারণ হতে পারে মশলা বা চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়া, ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় বা অ্যালকোহল পান করা । ধূমপান এবং অতিরিক্ত মানসিক চাপও অ্যাসিডিটি কারন হতে পারে।

অ্যাসিডিটির জন্য এমন কয়েকটি ঘরোয়া ঔষধ, যা হাতের কাছেই পাওয়া যায়, যেমন; পানি, আদা, পুদিনাপাতা, মেথি, পেঁপে

পানিঃ

পানি অ্যাসিডিটির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আপনার সেরা বন্ধু হতে পারে। এটি একটি সহজলভ্য এবং কার্যকর সমাধান যা আপনার গ্যাস্ট্রিকের উপসর্গগুলি দ্রুত উপশম করতে সাহায্য করে।

  • প্রচুর পরিমাণে পানি পান করা পাকস্থলীর অ্যাসিড পাতলা করে, যার ফলে জ্বালাপোড়া এবং অস্বস্তি কমে।
  • পানি হজম প্রক্রিয়াটিকে ত্বরান্বিত করতে সাহায্য করে, যা অ্যাসিডের সাথে খাবারের সংস্পর্শে আসার সময় কমিয়ে দেয়।
  • পানি খাদ্যনালী থেকে অ্যাসিড এবং অবশিষ্টাংশ ধুয়ে ফেলতে সাহায্য করে, যা জ্বালাপোড়া কমাতে এবং আরাম প্রদানে সাহায্য করে

কতটা পানি পান করা উচিত?

  • সাধারণত, প্রতিদিন ৮-১০ গ্লাস পানি পান করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
  • তারপরও, পানির চাহিদা নির্ভর করে আপনার ওজন, পরিশ্রমের মাত্রা এবং আবহাওয়ার উপর।
  • তৃষ্ণার্ত বোধ না করলেও নিয়মিত পানি পান করুন।
  • আপনার প্রস্রাব হালকা হলুদ রঙের হলে বুঝতে হবে যে, আপনি পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করছেন না।

কিছু পরামরশঃ

  • ঠান্ডা পানি পান করুন, ঠান্ডা পানি খাদ্যনালীতে একটি শীতলকরণ প্রভাব ফেলতে পারে এবং অ্যাসিডিটির দ্রুত উপশম করতে সাহায্য করতে পারে।
  • খাওয়ার সময় বা খাওয়ার পরপরই প্রচুর পরিমাণে পানি পান করা এড়িয়ে চলুন । কারণ, অ্যাসিডের সাথে খাবার সংস্পর্শে আসার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিতে পারে।
  • লেবুর পানি পান করুন কারন, লেবুর পানি পাকস্থলীর অ্যাসিডিটির মাত্রা কমাতে সাহায্য করতে পারে বলে মনে করা হয়।
  • ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার খান যেমন দুধ, দই এবং পাতলা সবুজ শাকসবজি বেশী বেশী খান।
  • মশলাযুক্ত এবং চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলুন কারন এই ধরনের খাবার অ্যাসিড উৎপাদন বৃদ্ধি করতে পারে এবং অ্যাসিডিটির উপসর্গগুলি বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

আদাঃ

আদা হাজার বছর ধরে ঔষধি গুণাবলীর জন্য ব্যবহৃত একটি জনপ্রিয় মশলা। এটি অ্যাসিডিটি সহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যার চিকিৎসায় একটি কার্যকর প্রাকৃতিক প্রতিকার হতে পারে।

আদা কীভাবে অ্যাসিডিটিতে সাহায্য করে:

  • আদায় অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা পাকস্থলীর আস্তরণের প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে, যা অ্যাসিডিটি এবং হজমে অস্বস্তি কমাতে পারে।
  • আদা হজম রসের নিঃসরণকে উদ্দীপিত করে এবং খাবার ভাঙতে সাহায্য করে, যা অ্যাসিডের সাথে খাবারের সংস্পর্শে আসার সময় কমিয়ে দেয়।
  • আদা বমি বমি ভাব প্রতিরোধে এবং চিকিৎসায় কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়েছে, যা অ্যাসিডিটির একটি সাধারণ উপসর্গ।

আদার ব্যবহারঃ

  • আদা চা: এক কাপ গরম পানিতে একটি ছোট টুকরো আদা (তাজা বা শুকনো) কেটে দিন। ৫-১০ মিনিট ঢেকে রাখুন। এরপর ছেঁকে পান করুন।
  • আদা জুস: এক টেবিল চামচ আদার রস এক গ্লাস পানিতে মিশিয়ে পান করুন।
  • আদা সুপ: আদা, গাজর, আলু এবং অন্যান্য সবজি দিয়ে তৈরি একটি হালকা স্যুপ তৈরি করুন।

সতর্কতাঃ 

  • যদি আপনি গর্ভবতী হন বা স্তন্যপান করান, তাহলে আদা ব্যবহার করার আগে আপনার ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করুন।
  • যদি আপনার রক্ত ​​পাতলা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাহলে আদা এড়িয়ে চলুন কারণ এটি রক্ত ​​পাতলা করার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
  • যদি আপনার অ্যাসিডিটির উপসর্গ তীব্র হয় বা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে ডাক্তারের সাথে দেখা করুন।

কিছু পরামর্শঃ 

  • ব্যায়ামঃ  নিয়মিত ব্যায়াম করুন কারন নিয়মিত ব্যায়াম হজম শক্তি বাড়াতে এবং অ্যাসিডিটির ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।
  • মানসিক চাপঃ মানসিক চাপ অ্যাসিডিটির ঝুঁকি বাড়াতে পারে। যোগব্যায়াম, ধ্যান বা গভীর শ্বাসের ব্যায়ামের মাধ্যমে চাপ কমাতে চেষ্টা করুন।
  • ঘুমঃ ঘুমের অভাব হজমে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে এবং অ্যাসিডিটির ঝুঁকি বাড়াতে পারে। প্রতি রাতে ৬ থেকে ৮ ঘন্টা ঘুমানোর চেষ্টা করুন।

পুদিনাপাতাঃ

পুদিনাপাতা (মিন্ট) অনেক উপকারী এবং বিভিন্নভাবে ব্যবহার করা হয়। পুদিনাপাতা, যা তার সতেজ সুবাস এবং সুস্বাদু স্বাদের জন্য পরিচিত। পুদিনাপাতা অ্যাসিডিটি সহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যার জন্য একটি কার্যকর প্রাকৃতিক ঔষধ হতে পারে।    

পুদিনাপাতা কীভাবে অ্যাসিডিটিতে সাহায্য করে:

পুদিনাপাতায় অ্যান্টিস্প্যাজমোডিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা পেটের পেশীগুলিকে শিথিল করতে এবং পেট ফোলাভাব, বেলচিং এবং অস্বস্তি কমাতে সাহায্য করে।

  • পুদিনাপাতা হজম রসের নিঃসরণকে উদ্দীপিত করে এবং খাবার ভাঙতে সাহায্য করে, যা অ্যাসিডের সাথে খাবারের সংস্পর্শে আসার সময় কমিয়ে দেয়।
  • পুদিনাপাতায় অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা পাকস্থলীর আস্তরণের প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে, যা অ্যাসিডিটি এবং হজমে অস্বস্তি কমাতে পারে।
  • পুদিনাপাতা বমি বমি ভাব প্রতিরোধে এবং চিকিৎসায় কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে, যা অ্যাসিডিটির একটি সাধারণ উপসর্গ।

পুদিনাপাতা ব্যবহারঃ 

চা: ফুটন্ত পানিতে পুদিনাপাতা যোগ করুন এবং ৫-১০ মিনিট ধরে ফুটতে দিন। চা ছেঁকে নিয়ে তাতে মধু যোগ করুন। এই চা দিনে ২-৩ বার পান করতে পারেন। এটি গ্যাস এবং বদহজম কমাতে সাহায্য করবে।

রস: তাজা পুদিনাপাতা থেকে রস বের করে এক চা চামচ পরিমাণ রস নিয়ে পান করতে পারেন। চাইলে এতে একটু লেবুর রস মিশিয়ে নিতে পারেন। এটি গ্যাসের সমস্যা কমাতে সাহায্য করবে।

তেল: পুদিনাপাতার তেল (Peppermint oil) পানিতে মিশিয়ে পান করতে পারেন। সাধারণত, এক গ্লাস পানিতে কয়েক ফোঁটা তেল মিশিয়ে পান করলে গ্যাসের সমস্যা কমাতে সাহায্য করে। তবে, এই তেল ব্যবহারের আগে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

পাতা চিবানো: তাজা পুদিনাপাতা চিবানো গ্যাস এবং বদহজমের সমস্যা কমাতে পারে। প্রতিদিন কিছু পাতা চিবিয়ে খেলে পেটের সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।

পুদিনাপাতার নিয়মিত ব্যবহারে হজম প্রক্রিয়া উন্নত হয় এবং পেটের গ্যাসের সমস্যা কমাতে সাহায্য করে। তবে, অতিরিক্ত গ্যাসের সমস্যায় প্রয়োজন হলে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

মেথিঃ

মেথি বীজ দীর্ঘদিন ধরে ঔষধি গুণাবলীর জন্য ব্যবহৃত হয়ে আসছে, এবং অ্যাসিডিটি প্রতিরোধেও এটি কার্যকর বলে মনে করা হয়। মেথিতে থাকা উপাদানগুলি পেটের পাতলা আবরন ঠাণ্ডা রাখতে এবং অ্যাসিডের ক্ষরণ কমাতে সাহায্য করতে পারে।

মেথি কীভাবে কাজ করে:

  • গ্যাস্ট্রোপ্রোটেক্টিভ এজেন্ট যা মেথিতে থাকা মিউসিলাজ পেটের আস্তরণে একটি প্রতিরক্ষামূলক বাধা তৈরি করে, যা অ্যাসিড থেকে জ্বালাপোড়া রক্ষা করতে সাহায্য করে।
  • মেথিতে অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা পেটের আস্তরণের প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে, যা অ্যাসিডিটির একটি সাধারণ কারণ।
  • মেথি হজম বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে, যা অ্যাসিডিটির ঝুঁকি কমাতে পারে।
  •  মেথি অ্যাসিড নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে, যা অ্যাসিডিটি প্রতিরোধে সহায়ক।

পরামর্শঃ 

  • গর্ভবতী বা স্তন্যদানকারী মহিলাদের মেথি ব্যবহার করার আগে ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করা উচিত।
  • যদি আপনার ডায়াবেটিস বা অন্য কোনও দীর্ঘস্থায়ী রোগ থাকে তবে মেথি ব্যবহার করার আগে ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করা উচিত।
  • যদি মেথি সেবনের পরে আপনার কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয়, যেমন পেট ফোলা বা অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়া, তাহলে ব্যবহার বন্ধ করুন এবং ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করুন।

পেঁপেঃ

পেঁপে দীর্ঘদিন ধরে ঔষধি গুণাবলীর জন্য ব্যবহৃত হয়ে আসছে, এবং অ্যাসিডিটি প্রতিরোধেও এটি কার্যকর বলে মনে করা হয়। পেঁপেতে থাকা এনজাইমগুলি হজম বৃদ্ধি করতে এবং অ্যাসিডের ক্ষরণ কমাতে সাহায্য করতে পারে। 

এটি ভিটামিন, খনিজ, এনজাইম এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ যা বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যার চিকিৎসায় সহায়ক হতে পারে।

পেঁপে কীভাবে গ্যাসের সমস্যায় সাহায্য করে:

  • পেঁপেতে থাকা পেপেইন নামক এনজাইম প্রোটিন হজমে সাহায্য করে। এটি অগ্ন্যাশয়ের চাপ কমাতে এবং হজমজনিত সমস্যা যেমন অম্বল, পেট ফোলাভাব, কোষ্ঠকাঠিন্য এবং ডায়রিয়ার চিকিৎসায় সহায়তা করতে পারে।
  • পেঁপেতে থাকা ফাইবার অন্ত্রের স্বাস্থ্য উন্নত করতে সাহায্য করে। এটি সুস্থ ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধির প্রবনতা বাড়ায় এবং ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়াকে দমন করে, যা গ্যাস সৃষ্টির প্রবনতা কমাতে সাহায্য করে।
  • পেঁপেতে অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা অন্ত্রের প্রদাহ কমাতে সাহায্য করতে পারে, যা গ্যাস তৈরির একটি সাধারণ কারন।
  • পেঁপেতে থাকা ফাইবার কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করে, যা গ্যাস তৈরির আরও একটি সাধারণ কারন।

কিভাবে খাবেন:

  • খাবারের পর ১ টুকরা পাকা পেঁপে খান। এটি সবচেয়ে সহজ উপায়।
  • ১ কাপ পানিতে ১ টুকরা পাকা পেঁপে ব্লেন্ড করে জুস করে পান করুন।
  • পেঁপে, দই, কলা এবং মধু একসাথে ব্লেন্ড করে পেঁপে শেক তৈরি করে পান করুন।

কতটা খাবেন:

  • পাকা পেঁপে: প্রতিদিন ১-২ টুকরা পাকা পেঁপে খাওয়া যথেষ্ট।
  • পেঁপে জুস: প্রতিদিন ১-২ কাপ পেঁপে জুস পান করা যথেষ্ট।
  • পেঁপে বীজ: প্রতিদিন ১ চা চামচ পেঁপে বীজ খাওয়া যথেষ্ট।
  • পেঁপে শেক: সপ্তাহে ২-৩ বার পেঁপে শেক পান করা যথেষ্ট।

কখন খাবেন:

  • খাবারের পর ১ টুকরা পেঁপে খাওয়া সবচেয়ে ভালো। এটি হজম বৃদ্ধি করতে সাহায্য করবে।
  • পেঁপে বীজ রাতে ১ কাপ পানিতে ভিজিয়ে রাখুন এবং সকালে খালি পেটে খান। এটি কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করবে।
  • পেঁপে জুস বা পেঁপে শেক যেকোনো সময় খাওয়া যেতে পারে।

কিছু পরামর্শ:

  • পাকা পেঁপে ব্যবহার করুন কারন, অপরিপক্ব পেঁপেতে পেপেইন এনজাইম কম থাকে।
  • বীজ ফেলে দিবেন না, পেঁপে বীজে অনেক পুষ্টি উপাদান থাকে।
  • পেঁপে জুস বা পেঁপে শেকের স্বাদ বৃদ্ধি করতে প্রয়োজনে  চিনি বা মধু যোগ করতে পারেন।

পরিশেষে, যদি আপনার ডায়াবেটিস বা অন্য কোনও দীর্ঘস্থায়ী রোগ থাকে তবে পেঁপে খাওয়ার আগে ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করা উচিত। যদি আপনার পেঁপে অ্যালার্জি থাকে তবে এটি এড়িয়ে চলুন। গ্যাসের তীব্রতার ক্ষেত্রে, ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করা উচিত।   

1 thought on “অ্যাসিডিটির ঘরোয়া ঔষধ হাতের কাছেই”

  1. Pingback: রোগ থেকে মুক্তি পেতে রসূল (সাঃ) নির্দেশিত ৫টি সুন্নতি মহাঔষধ - Update Info BD

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top