রোগ থেকে মুক্তি পেতে রসূল (সাঃ) নির্দেশিত ৫টি সুন্নতি মহাঔষধ

রাসূলের নির্দেশিত পাঁচটি সুন্নতি মহাঔষধ

রাসুলে করীম (ﷺ) যেভাবে আমাদের আখিরাতের সফলতার পথ ও পদ্ধতি সুন্দরভাবে শিখিয়েছেন, তেমনিভাবে দুনিয়ার জীবনে বিভিন্ন রোগ-বালাই এবং অসুখ-বিসুখ থেকে নিরাপদ থাকার জন্যও বহু উপায় বাতলে দিয়েছেন। তিনি শুধু আধ্যাত্মিক কল্যাণের শিক্ষা দেননি, বরং শারীরিক সুস্থতার জন্যও আমাদের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।

আমাদের অনেক দোয়া, যিকির এবং আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনার পদ্ধতি শিখিয়েছেন, যা আমাদেরকে বিপদ ও রোগ থেকে রক্ষা করতে পারে। আর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তার প্রসঙ্গে বলেছেনঃ

وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَىٰٓ إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْىٌ يُوحَىٰ  –“আর তিনি (প্রবণতা থেকে) নিজের ইচ্ছায় কথা বলেন না। এটি তো কেবল প্রত্যাদেশ যা তার প্রতি প্রেরিত হয়।” সুরাঃ আন-নাজম (৫৩:৩-৪)

যার কারণে, রাসুলে করীম (ﷺ) যেসব চিকিৎসার কথা বলেছেন, তা ওহি দ্বারা প্রাপ্ত, হোক তা প্রত্যক্ষভাবে বা পরোক্ষভাবে। আমাদের এই জীবনে যদি কোনো অসুখ-বিসুখ থেকে বাঁচার সব আপাত উপায় বন্ধ হয়ে যায়, সব পথ রুদ্ধ হয়ে যায়, তবুও একজন মুমিন হিসেবে নবী (ﷺ) এর বাতলানো সেই মহৌষধ ও চিকিৎসাগুলো আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় এবং শেষ অবলম্বন হিসেবে থেকে যায়।

আজ আমরা রোগ থেকে মুক্তি পেতে রসূল (সাঃ) নির্দেশিত ৫টি সুন্নতি মহাঔষধ-এর কথা বলবো, যেগুলোর মধ্যে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সকল রোগ-বালাই থেকে নিরাপদে এবং সুস্থ থাকার উপাদান নিহিত রেখেছেন। 

কালোজিরাঃ

রোগ থেকে মুক্তি পেতে রসূল (সাঃ) নির্দেশিত ৫টি সুন্নতি মহাঔষধ-এর মধ্যে সর্বপ্রথম যে বিষয়টির কথা বলবো তা হল কালোজিরা এই প্রসঙ্গে সহিহ বুখারি হাদিসে আসছে, নবী (আঃ) বলেছেনঃ

 عَلَيْكُمْ بِهَذِهِ الْحَبَّةِ السَّوْدَاءِ، فَإِنَّ فِيهَا شِفَاءً مِنْ كُلِّ دَاءٍ إِلَّا السَّام
“তোমরা কালোজিরা গ্রহণ করো। এতে সমস্ত রোগের নিরাময় রয়েছে, মৃত্যুকে ব্যতীত।”
সহীহ বুখারি, হাদিস নম্বর: ৫৬৮৮

অর্থাৎ, কালোজিরায় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মৃত্যু ছাড়া পৃথিবীর অন্য সব রোগের প্রতিষেধক ও চিকিৎসার উপাদান রেখেছেন। যদি কেউ কালোজিরা গ্রহণ করেন—সে সরাসরি খাওয়া হতে পারে, তেল বানিয়ে খাওয়া হতে পারে, পান করে বা ভর্তা বানিয়েও খাওয়া যেতে পারে—যেভাবেই গ্রহণ করা হোক না কেন, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এর মাধ্যমে আরোগ্য লাভের তওফিক দান করেন।

অতএব, কালোজিরার ভেতরে রয়েছে সর্ব রোগের ওষুধ। এটি নিয়মিত খাওয়া অত্যন্ত উপকারী এবং সুস্থ থাকার জন্য আমাদেরকে নিয়মিতভাবে কালোজিরা গ্রহণ করা দরকার। এর ব্যবহারের মাধ্যমে আল্লাহর রহমত ও সুস্থতা লাভের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়।

আরও পড়ুনঃ অ্যাসিডিটির ঘরোয়া ঔষধ হাতের কাছেই

মধুঃ

দ্বিতীয়ত, যে চিকিৎসার কথা তিনি বলেছেন, তা হল মধু। মধু প্রসঙ্গে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নিজেই বলেছেনঃ

فِیۡہِ شِفَآءٌ لِّلنَّاسِ অর্থঃ “এতে মানুষের জন্য আরোগ্য রয়েছে।” (সুরাঃ নাহাল, আয়াত ৬৯)

নবী (আঃ) নিজে মধু পছন্দ করতেন, যেমনিভাবে বোখারি মুসলিম শরিফে বর্ণনা করেছেন। আর সেইসাথে  তিনি বলেছেনঃ

عَلَيْكُمْ بِالشِّفَاءِينِ: الْعَسَلِ وَالْقُرْآنঅর্থঃ “তোমরা দুইটি নিরাময়ের মাধ্যম গ্রহণ করো: মধু এবং কুরআন।”

এই হাদিসে নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মধু এবং পবিত্র কুরআনের চিকিৎসা গুণাগুণের প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন। মধু শারীরিক রোগের জন্য উপকারী আর কুরআন আত্মিক আরোগ্যের জন্য।

“তোমরা সব সময় দুটি শেফা বা আরোগ্য লাভের উপায় অবলম্বন করবে। একটির হলো মধু পান করা এবং অন্যটি হলো কোরআন কারিমের তেলাওয়াত করা।”

মধু একটি প্রাকৃতিক ওষুধ, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং বিভিন্ন রোগ থেকে শরীরকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। কুরআন কারিমের তেলাওয়াত বা পঠন আত্মার প্রশান্তি আনে এবং ঝাড়ফুঁক বা রুকইয়াহ হিসেবে চিকিৎসার কাজ করে। 

কুরআনের আয়াতের মাধ্যমে ঝাড়ফুঁক করা যেমন আত্মিক ও মানসিক রোগের নিরাময় হতে পারে, তেমনি শারীরিকভাবে সুস্থ থাকার জন্য মধু পান করাও অত্যন্ত কার্যকর। তাই কোরআন এবং মধু, উভয়কেই আমরা আরোগ্যের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করতে পারি।

হেজামাঃ

তৃতীয়ত, হেজামা বা যেটাকে আমরা সিঙ্গা লাগানোর কথা বলি, এই হেজামা বা সিঙ্গা লাগানো এটাও সর্ব রোগের মহৌষধ। নবী (ﷺ) নিজে হেজামা গ্রহণ করতেন এবং হাদীসে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেনঃ

إِنَّ أَفْضَلَ مَا تَدَاوَيْتُمْ بِهِ الْحِجَامَةُ –অর্থঃ “তোমাদের চিকিৎসার সর্বোত্তম পদ্ধতি হলো হিজামা।” (সহিহ বুখারি: ৫৬৯৬)

এই হাদিসে হিজামার চিকিৎসাগত উপকারিতার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যা নবী করিম (ﷺ) সুপারিশ করেছেন। হিজামা শরীর থেকে ক্ষতিকর রক্ত অপসারণের মাধ্যমে বিভিন্ন রোগ থেকে আরোগ্য লাভে সাহায্য করে। এটি ইসলামে বিশেষভাবে সুন্নাত এবং স্বাস্থ্য রক্ষার একটি প্রামাণ্য পদ্ধতি হিসেবে স্বীকৃত।

জমজমের পানিঃ

জমজমের পানি প্রসঙ্গে সহি মুসলিম হাদিসে আসছে,নবী (ﷺ) বলেছেনঃ

مَاءُ زَمْزَمَ شِفَاءُ سُقْم   অর্থঃ “জমজমের পানি রোগের জন্য আরোগ্য।”

এই হাদিসে নবী করিম (ﷺ) জমজমের পানির নিরাময়কারী গুণাবলীর কথা বলেছেন। জমজমের পানি শারীরিক ও আত্মিক আরোগ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী, এবং এটি একটি বরকতময় পানি হিসেবে মুসলিম উম্মাহর কাছে বিশেষ মর্যাদা রাখে।

অন্য এক বর্ণনায় আসছে,

 ماءُ زمزمَ لِما شُرِبَ لهُ  –অর্থঃ “জমজমের পানি যে উদ্দেশ্যে পান করা হয়, তা অর্জিত হয়।” (সহিহ মুসলিম: ২৪৭৩)।

এটি বোঝায় যে, জমজমের পানি খুব বরকতময় এবং এর পানির মাধ্যমে যে উদ্দেশ্য বা চাহিদা পূরণের জন্য তা পান করা হয়, আল্লাহ তাআলার ইচ্ছায় সেই উদ্দেশ্য পূর্ণ হয়। এটি শরীরিক চিকিৎসা, আত্মিক প্রশান্তি বা কোনো বিশেষ দোয়া পূর্ণ করতে পান করা হতে পারে।

এই হাদিসটি জমজমের পানির বিশেষত্ব ও বরকত তুলে ধরে নবী করিম (ﷺ) বলেছেন যে, জমজমের পানি পান করার সময় যদি কোনো উদ্দেশ্য বা দোয়া করা হয়, তবে আল্লাহর ইচ্ছায় সেই উদ্দেশ্য পূর্ণ হতে পারে। 

উদাহরণস্বরূপ, যদি কেউ শরীরিক আরোগ্য, জীবিকা বা কোনো বিশেষ চাহিদা পূরণের জন্য জমজমের পানি পান করে, তবে আল্লাহ তা পূর্ণ করেন। এই পদ্ধতিতে পান করার সময় আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস রাখতে হবে।

আজওয়া খেজুরঃ

আজওয়া খেজুর হচ্ছে বিশেষ ধরনের একটি খেজুর। এটি একটি সুস্বাদু, পুষ্টিকর এবং প্রাকৃতিক উপাদানে পূর্ণ খেজুর। ইসলামী ঐতিহ্য অনুযায়ী, আজওয়া খেজুরের অনেক ধর্মীয় এবং স্বাস্থ্যগত উপকারিতা রয়েছে। এটি মুসলিম উম্মাহর মধ্যে একটি পবিত্র ও সম্মানিত ফল হিসেবে পরিচিত।

এই বিশেষ প্রকৃতির খেজুরের দাম একটু বেশি। এই খেজুর প্রসঙ্গে নবী (ﷺ) বলছেনঃ

مَن تَصَبَّحَ بِسَبْعَةِ تَمَرَاتٍ عَجْوَةٍ لَمْ يَضُرُّهُ فِي ذَاكَ الْيَوْمِ سَمٌّ وَلَا سِحْرٌ –অর্থঃ “যে ব্যক্তি প্রতিদিন সকালে সাতটি আজওয়া খেজুর খায়, সে দিনটি কোনো বিষ বা জাদুর ক্ষতি তাকে করতে পারবে না।”  (সহিহ বুখারিঃ ৫৭০৫)

অতএব, আজওয়া খেজুরে রয়েছে একটি প্রাকৃতিক প্রতিষেধক এবং চিকিৎসা, যা সর্বপ্রকার রোগের জন্য উপকারী। এটি প্রতিটি রোগের বিরুদ্ধে কার্যকরী একটি বরকতময় খাদ্য।

উপসংহারঃ

উপরের রোগ থেকে মুক্তি পেতে রসূল (সাঃ) নির্দেশিত ৫টি সুন্নতি মহাঔষধ-এর প্রত্যেকটার ভেতরেই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা অলৌকিকভাবে চিকিৎসার গুণ রেখেছেন। আল্লাহ তাআলা আমাদের জন্য এমন উপাদান সৃষ্টি করেছেন, যা আরোগ্য লাভের অসাধারণ উপায় হিসেবে কাজ করে। 

তাঁর অসীম করুণায় এই উপাদানগুলো শারীরিক ও আত্মিক সুস্থতা প্রদান করে এবং যে কোনো দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে রক্ষা পাওয়ার পথ দেখায়। সেই সাথে আমরা নবী (আঃ) এর বাতানো বিভিন্ন দোয়া অবলম্বন করতে পারি, যেমনঃ

بِسْمِ اللّٰهِ الَّذِي لَا يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَيْءٌ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ –অর্থ: “আল্লাহর নামে (শুরু করছি), যার নামের বরকতে আকাশ ও জমিনের কোনো কিছুরই কোনো ক্ষতি হতে পারে না। তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞানী।

হাদিসে বর্ণিত আছে, যে ব্যক্তি এই দোয়া দিনে তিনবার পাঠ করবে, তাকে কোনো আকস্মিক বিপদ বা ক্ষতি স্পর্শ করতে পারবে না। এটি বিপদ থেকে রক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকরী দোয়া।

সেই সাথে সুরা ফাতিহা, যা সব রোগের জন্য একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও অলৌকিক চিকিৎসা। এটি “শিফা” (আরোগ্য) সুরা হিসেবেও পরিচিত। যদি সুরা ফাতিহা পড়ে কোনো পানিতে ফুঁ দিয়ে তা পান করা হয়, অথবা কোনো খাবারে ফুঁ দিয়ে খাওয়া হয়, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাঁর অসীম করুণায় এর মাধ্যমে আমাদের জন্য আরোগ্য দান করবেন।

পরিশেষে, আল্লাহ আমাদের সবাইকে হেফাজত করুন এবং সুস্থতা দান করুন। আমিন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top