মেথি গাছ (Fenugreek) একটি এক বার্ষিক উদ্ভিদ যা ভেষজ, মশলা এবং উদ্ভিজ্জ হিসাবে ব্যবহৃত হয়। এর বৈজ্ঞানিক নাম Trigonella foenum-graecum। মেথি গাছের পাতা এবং বীজ উভয়ই খাওয়া হয় এবং প্রাচীনকাল থেকে বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়।
গাছ সাধারণত ২-৩ ফুট উচ্চতা পর্যন্ত বৃদ্ধি পায় এবং এর পাতা তিনটি ছোট ছোট অংশে বিভক্ত থাকে। মেথির বীজগুলো ছোট, হলুদাভ বাদামী রঙের এবং তিক্ত স্বাদের হয়। এটি ভারত, মধ্যপ্রাচ্য এবং ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের স্থানীয়, তবে এখন বিশ্বব্যাপী ব্যাপকভাবে চাষ করা হয়।
মেথি রান্না, ঔষধ এবং ঘরোয়া প্রতিকারে বহু শতাব্দী ধরে ব্যবহৃত হচ্ছে। এটি ভিটামিন এবং খনিজ পদার্থে সমৃদ্ধ, যার মধ্যে রয়েছে লোহা, ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম এবং ভিটামিন বি৬। মেথিতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টও থাকে, যা শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত কোষ থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে।
মহিলাদের জন্য মেথি’র অনেক সম্ভাব্য স্বাস্থ্য উপকার রয়েছে। এটি নিয়মিত মাসিক চক্র নিয়ন্ত্রণ করতে, পিরিয়ডের ব্যথা কমাতে, স্তন্যদুগ্ধ উৎপাদন বাড়াতে এবং মেনোপজের লক্ষণগুলি উপশম করতে সাহায্য করতে পারে।
মেথি ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে, কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে পারে এবং ওজন কমাতে সাহায্য করে।
মেথি বিভিন্নভাবে খাওয়া যায়। এটি চা বা ওটমিলের মতো খাবারের সাথে গুঁড়ো করে খাওয়া যেতে পারে। বীজ বা গোটাও খেতে পারেন। মেথি তেল ত্বকের যত্ন এবং অ্যারোমাথেরাপি পণ্যগুলিতে ব্যবহৃত হয়। মেথি বেশিরভাগ মানুষের জন্য নিরাপদ বলে মনে করা হয়।
আপনার যদি কোনো চিকিৎসার অবস্থা থাকে বা ওষুধ সেবন করে থাকেন, তাহলে মেথি খাওয়ার আগে আপনার ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করা জরুরি।
যাইহোক, কিছু সমস্যা রয়েছে যা মহিলারা মেথির সাহায্যে সমাধান করতে পারেন, যথা:
- মাসিক চক্র নিয়ন্ত্রণ করতে
- পিরিয়ডের ব্যথা কমাতে
- স্তন্যদানকালে বুকের দুধ বৃদ্ধিতে
- মেনোপজের লক্ষণগুলি উপশম করতে
- ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করতে
- কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে
- ওজন কমাতে
নিচে এই বিষয়গুলোর উপর বিস্তারিত আলোচনা করা হলো,
মাসিক চক্র নিয়ন্ত্রণ করতেঃ
- মেথি বীজ মাসিক চক্র নিয়ন্ত্রণ সহ এর ঔষধি গুণাবলীর জন্য দীর্ঘকাল ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
- মেথির বীজে ডায়োসজেনিন নামক একটি যৌগ থাকে, যা ইস্ট্রোজেনের মতো কাজ করে এবং মাসিক চক্র নিয়ন্ত্রণে ও হরমোনগুলোর ভারসাম্য রক্ষা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
- মেথিতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীর থেকে টক্সিন দূর করতে সাহায্য করে এবং মাসিক চক্র নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
- মেথি প্রজাস্টেরন হরমোনের উৎপাদন বাড়াতে সাহায্য করে, যা মাসিক চক্র নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।
পিরিয়ডের ব্যথা কমাতেঃ
- প্রোস্টাগ্লান্ডিনের মাত্রা কমায়ঃ মেথিতে অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা প্রোস্টাগ্লান্ডিনের উৎপাদন কমাতে সাহায্য করে। প্রোস্টাগ্লান্ডিন হলো যৌগ যা গর্ভাশয়ের সংকোচন ঘটায়, যার ফলে পিরিয়ডের ব্যথা হয়।
- এন্ডোরফিন নিঃসরণ বাড়ায়: মেথি শরীরের এন্ডোরফিন নিঃসরণ বাড়াতে সাহায্য করতে পারে, যা প্রাকৃতিক ব্যথানাশক হিসেবে কাজ করে।
- রক্ত সঞ্চালন উন্নত করে: মেথি রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি করতে সাহায্য করতে পারে, যা পিরিয়ডের ব্যথা কমাতে সাহায্য করতে পারে।
- মাংসপেশীর সংকোচন কমায়: মেথিতে পেশী শিথিলকারী বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা জরায়ুর পেশীগুলির সংকোচন কমায়, যার ফলে মাসিকের ক্র্যাম্প উপশম হয়।
এছাড়াও, মেথি বীজে অ্যান্টি-স্প্যাজমোডিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা মাসিকের ব্যথা কমাতে সাহায্য করতে পারে। অ্যান্টি-স্প্যাজমোডিক (Antispasmodic) একটি পদার্থ যা পেশী বা অঙ্গপ্রত্যঙ্গে অস্বাভাবিক সংকোচন বা খিঁচুনি (স্প্যাজম) প্রতিরোধ বা উপশম করতে ব্যবহৃত হয়।
ব্যবহারঃ পিরিয়ড শুরুর ২ দিন আগে থেকে মেথি ভেজানো পানি পান করুন।
স্তন্যদানকালে বুকের দুধ বৃদ্ধিতেঃ
মেথিতে ডায়োফেনিন নামক একটি যৌগ থাকে, যা গ্যালাক্টোজেন হিসেবে পরিচিত। গ্যালাক্টোজেন হল দুধের প্রাথমিক শর্করা। কেউ কেউ বিশ্বাস করেন যে জিওফেনিন শরীরে গ্যালাক্টোজেন উৎপাদন বাড়াতে সাহায্য করে, যার ফলে দুধের উৎপাদন বৃদ্ধি পায়।
দুধ উৎপাদনে জড়িত এমন হরমোন নিয়ন্ত্রণে মেথি ভূমিকা রাখতে পারে। প্রোল্যাক্টিন হরমোন দুধ উৎপাদনের জন্য দায়ী। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে যে মেথি প্রোল্যাক্টিনের মাত্রা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।
সতর্কতাঃ
- গর্ভবতী বা স্তন্যদানকারী মহিলাদের মেথি সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের আগে তাদের ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করা উচিত।
- মেথি কিছু ওষুধের সাথে প্রতিক্রিয়া করতে পারে।
ব্যবহারঃ প্রতিদিন ১-২ কাপ মেথি চা পান করুন।
আরও পড়ুনঃ পেটের গ্যাস বা গ্যাস্ট্রিক সমস্যায় মেথি
মেনোপজের লক্ষণগুলি উপশম করতেঃ
- মেথিতে ডায়োফেনিন নামক একটি যৌগ থাকে, যা ফাইটোএস্ট্রোজেন হিসাবে পরিচিত। ফাইটোএস্ট্রোজেনগুলি শরীরের নিজস্ব ইস্ট্রোজেনের অনুরূপ।
- মেনোপজের সময় ইস্ট্রোজেনের মাত্রা হ্রাস পায়, যা গরম আঘাত, মেজাজের পরিবর্তন এবং ঘুমের সমস্যার মতো লক্ষণগুলির দিকে নিয়ে যেতে পারে। ফাইটোএস্ট্রোজেনগুলি এই লক্ষণগুলি উপশম করতে সাহায্য করতে পারে।
- মেথিতে প্রদাহ-বিরোধী বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা গরম আঘাত এবং যৌন মিলনের সময় ব্যথা সহ মেনোপজের কিছু লক্ষণ উপশম করতে সাহায্য করতে পারে।
- মেথি মেজাজের উন্নতি এবং উদ্বেগ ও বিষণ্ণতার মতো মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যাগুলি হ্রাস করতে সাহায্য করতে পারে।
ব্যবহারঃ প্রতিদিন ১-২ চা চামচ মেথির বীজ গুঁড়ো করে খান।
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করতেঃ
- মেথি, যা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করার জন্য দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে, বিশেষ করে মহিলাদের ক্ষেত্রে। এটি বিভিন্ন উপায়ে কাজ করে।
- মেথি শরীরের কোষগুলিকে ইনসুলিনের প্রতি আরও সংবেদনশীল করে তোলে, যার অর্থ ইনসুলিন রক্ত থেকে গ্লুকোজ শোষণে আরও কার্যকর হয়, ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা কমে যায়।
- মেথি কিছু এনজাইমের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয় যা গ্লুকোজের শোষণ নিয়ন্ত্রণ করে, যার ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়া রোধ হয়।
- গবেষণায় দেখা গেছে যে, মহিলাদের জন্য মেথি নিউরোপেপ্টাইড YY (NPY) নামক একটি হরমোনের নিঃসরণ বৃদ্ধি করতে পারে, যা ইনসুলিন নিঃসরণকে উদ্দীপিত করে।
অন্যান্য আরও সুবিধা:
- ওজন হ্রাস: মেথি ক্ষুধা দমন করে এবং পূর্ণতার অনুভূতি বৃদ্ধি করে ওজন হ্রাসে সহায়তা করতে পারে, যা টাইপ ২ ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
- প্রদাহ কমায়: মেথি প্রদাহের বিরুদ্ধে লড়াই করে, যা ডায়াবেটিসের জটিলতার একটি প্রধান কারণ।
- কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ: মেথি LDL (খারাপ) কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে এবং HDL (ভাল) কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে, যা হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে পারে।
ব্যবহারঃ প্রতিদিন ২-৩ চা চামচ মেথির বীজ গুঁড়ো করে খান। মেথি ডায়াবেটিসের জন্য একটি ঔষধের বিকল্প নয়। এটি ঔষধের সাথে ব্যবহার করা উচিত।
কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতেঃ
মেথি মহিলাদের কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে বিশেষ ভুমিকা পালন করে মেথি বীজে থাকা বিভিন্ন উপাদান যেমন স্যাপোনিন, ফাইবার এবং ফাইটোকেমিক্যালস কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক বলে পরিচিত।
কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে মেথি যেভাবে কাজ করেঃ
- মেথি বীজে উপস্থিত স্যাপোনিন (Saponins) শরীরে কোলেস্টেরলের শোষণ কমাতে সাহায্য করে। এটি কোলেস্টেরলের সংমিশ্রণ ভেঙে দেয় এবং শরীর থেকে তা দূর করতে সাহায্য করে।
- মেথি বীজে উচ্চমাত্রার দ্রবণীয় ফাইবার (Fiber) রয়েছে, যা কোলেস্টেরল শোষণে সহায়ক হয়। দ্রবণীয় ফাইবার অন্ত্রে কোলেস্টেরল যুক্ত পদার্থের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে তা শরীর থেকে দূর করে।
- মেথি বীজে বিভিন্ন প্রকারের ফাইটোকেমিক্যালস (Phytochemicals) রয়েছে, যা অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের কাজ করে এবং শরীরের বিপাকক্রিয়ার উন্নতি ঘটায়।
মেথি বীজ প্রাকৃতিকভাবে ওজন কমাতে সাহায্য করে, তবে কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যবহারঃ ২-৩ চা চামচ মেথি বীজের গুঁড়া পানিতে মিশিয়ে প্রতিদিন খেতে পারেন।
ওজন কমাতেঃ
মহিলাদের ওজন কমাতে মেথি বা ফেনুগ্রিক (Fenugreek) সহায়ক হতে পারে। মেথি বীজে থাকা বিভিন্ন উপাদান যেমন ফাইবার এবং প্রোটিন, ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ, বিপাক বৃদ্ধির মাধ্যমে ওজন কমাতে সাহায্য করে।
মেথি কীভাবে ওজন কমাতে কাজ করে?
- মেথির বীজে প্রচুর পরিমাণে দ্রবণীয় ফাইবার থাকে, যা খাওয়ার পরে পাকস্থলীতে ফুলে ওঠে এবং দীর্ঘ সময় ধরে পেট ভর্তি রাখে। এটি ক্ষুধা কমায় এবং অতিরিক্ত খাওয়া প্রতিরোধ করে।
- মেথি বীজ রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। রক্তে শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল থাকলে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা কমে যায় এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়।
- মেথির বীজ শরীরের মেটাবলিজম উন্নত করতে সাহায্য করে। একটি উচ্চতর বিপাক মানে আপনার শরীর দ্রুত ক্যালোরি পোড়ায়, যা আপনাকে ওজন কমাতে সাহায্য করে।
- মেথির বীজ শরীর থেকে টক্সিন দূর করতে সাহায্য করে, যা শরীরকে সুস্থ রাখে এবং ওজন কমাতে সাহায্য করে।
প্রাকৃতিক উপায়ে ওজন কমাতে মেথি বীজ সহায়ক হতে পারে। তবে স্বাস্থ্যকর খাবার, সঠিক ডায়েট এবং নিয়মিত ব্যায়াম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যবহারঃ ওজন কমাতে প্রতিদিন ১-২ চা চামচ মেথির বীজ গুঁড়ো করে খাওয়া যেতে পারে।
পরিশেষে, মহিলাদের জন্য মেথি একটি অত্যন্ত উপকারী প্রাকৃতিক উপাদান। এটি বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত সুবিধা প্রদান করে, যেমন হরমোন ভারসাম্য রক্ষা, রক্তে চিনি নিয়ন্ত্রণ, ত্বক ও চুলের যত্ন, এবং হার্টের স্বাস্থ্য রক্ষা করে।
নিয়মিত মেথির ব্যবহার মহিলাদের সামগ্রিক স্বাস্থ্য ও সুস্থতা বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে। তবে, মেথি খাওয়ার সময় কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।